Vice Principal Messages

Vice Principal Messages


Dear Kabi Nazrul Govt. College Community


As the Vice Principal of Kabi Nazrul Government College,Dhaka I am thrilled to
announce the creation of our new website. In this modern era, a dedicated
website is indispensable for educational institutions, serving as a digital gateway
to disseminate information efficiently. Our website will act as a centralized
platform, providing easy access to academic resources, announcements, and
event details for students, parents, and departments.
Embracing technology is crucial for enhancing communication, and the website
will facilitate seamless interaction between the college administration and
stakeholders and government . It will also showcase the diverse academic and
extracurricular activities, fostering transparency and pride within our college
community. The website’s user-friendly design aims to create an immersive
experience, encouraging active participation and engagement.
In the age of digital learning, the website will be a valuable tool for students to
access online materials, assignments, and important updates. Additionally,
prospective students will benefit from comprehensive information about our
college, contributing to a positive first impression. The launch of our website
reflects our commitment to adaptability and innovation in education, ensuring
Kabi Nazrul Government College,Dhaka remains at the forefront of modern
educational practices.


Professor Saleh Ahmed Fakir

Vice Principal

Kabi Nazrul Govt. College, Dhaka


স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ

মুক্তিযুদ্ধ  ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং ঐ বছর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম ছিল বহুবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমাবনতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে যেসব ইস্যুতে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তার মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এতদ্সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতেই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতা  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একক প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনিই হন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখাগরিষ্ঠ দলের নেতা। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব সংখাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ শেখ মুজিব যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তাতেই পাকিস্তানী সামরিক জান্তার নিকট তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ইতোমধ্যে সমস্যা নিরসনের জন্য শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈন্য এবং আধা সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।

গণহত্যা, ১৯৭১

২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের উপর অপারেশন চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে প্রথম সদরদপ্তরটি গঠিত হয়। এখানে ৫৭তম বিগ্রেডের বিগ্রেডিয়ার আরবাবকে শুধু ঢাকা নগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবং মেজর জেনারেল খাদিম রাজাকে প্রদেশের অবশিষ্টাংশে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।

ছাত্ররা এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মীরা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয়। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা ওয়ারলেস বসানো জিপ ও ট্রাকে করে ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। তাদের প্রথম সাঁজোয়া বহরটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এক কিলোমিটারের মধ্যে ফার্মগেট এলাকায় ব্যরিকেডের মুখে পড়ে। রাস্তার এপাশ-ওপাশ জুড়ে ফেলে রাখা হয়েছিল বিশালাকৃতির গাছের গুঁড়ি। অকেজো পুরোনো গাড়ি ও অচল ষ্টীম রোলারও ব্যরিকেডের কাজে ব্যবহার করা হয়। কয়েকশ লোক প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেয়। তবে সেনাদের গুলি দ্রুতই তাদের নিস্তদ্ধ করে দেয়, সেনাবহর শহরময় ছড়িয়ে শুরু করে  গণহত্যা

পাকিস্তানি সৈন্যরা রাস্তায়-ফুটপাতে যাকেই দেখতে পায় তাকেই হত্যা করে, সামনে পড়া সবকিছু ধ্বংসের হুমকি দেয়। বাছবিচার না করে শহরের মানুষ ও সরকারি-বেসরকারি সব ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করে চষে বেড়ায় সৈন্যদের ট্যাঙ্ক। কামান ও বন্দুকের গোলায় ধ্বংস করে বহু আবাসিক এলাকা, আগুন ধরিয়ে দেয় বাড়িঘরে। সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ঢুকে অনেক ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককেও ঐ রাতে হত্যা করে। পুরনো ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তারা হামলা চালায়, অসংখ্য মানুষ হত্যা করে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় ও লুটপাট করে, মহিলাদের ধর্ষণ করে।#

নিরস্ত্র জনগণের উপর এই হামলা ও নির্বিচার গণহত্যা অভিযান বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রচারিত হয়। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে।

শরণার্থী, ১৯৭১

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের সকল এলাকায় স্বাধীনতার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। এই অভ্যুত্থানে অংশ নেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ। পাকবাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা প্রতিরোধ প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্পস্থায়ী হয়। শত্রু সেনারা সংখ্যায় অনেক ও তারা ছিল অনেক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, তাই মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। শীঘ্রই দেশের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন মুক্তিসংগ্রামীদের একটি একক কমান্ডের অধীনে আনা হয়।

এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চা বাগানে পরিবৃত আধা-পাহাড়ি এলাকা তেলিয়াপাড়ায় অবস্থিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের সদরদপ্তরে একত্রিত হন। কর্নেল এম.এ.জি ওসমানী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুর রব, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ রেজা, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফাত জামিল, মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখ সেনা কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন। এ সভায় চারজন সিনিয়র কমান্ডারকে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর সফিউল্লাহকে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অঞ্চলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। কুমিল্লা-নোয়াখালি অঞ্চলের অধিনায়কের দায়িত্ব পান মেজর খালেদ মোশাররফ। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মেজর জিয়াউর রহমান এবং কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলের অধিনায়ক হন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। এ সভাতেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাহিনী সম্পর্কিত সাংগঠনিক ধারণা এবং কমান্ড কাঠামোর রূপরেখা প্রণীত হয়। কর্নেল এম.এ.জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় নেতৃত্ব দেয়া হয়।

১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার তথা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। পরদিনই তাজউদ্দিন আহমদ আরও তিনজন আঞ্চলিক অধিনায়কের নাম ঘোষণা করেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজিশ রংপুর অঞ্চলের, মেজর নাজমুল হক দিনাজপুর-রাজশাহী-পাবনা অঞ্চলের এবং মেজর এম.এ জলিল বরিশাল-পটুয়াখালি অঞ্চলের অধিনায়কত্ব লাভ করেন। প্রতিটি অঞ্চলকে একেকটি সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১০ থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের এক সম্মেলনে অপারেশন চালানোর সুবিধার্থে সমগ্র বাংলাদেশকে এগারোটি সেক্টর ও বিভিন্ন সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়।

অস্ত্রচালনা প্রশিক্ষনরত মুক্তিবাহিনী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৭ মার্চ বাঙালিদের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তাঁর সরকারের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) অত্যাচরিত ও ভীতসন্ত্রস্ত বাঙালিদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে বাঙলাদেশ-ভারত সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারগুলো সীমান্ত বরাবর শরণার্থী শিবির স্থাপন করে। এ শিবিরগুলো থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করা হতো। পাকিস্তানি সৈন্যদের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার অদম্য বাসনায় ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে যুদ্ধের কৌশল, অস্ত্র চালনা ও বিস্ফোরক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের বিভিন্ন সেক্টরে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত করা হয়। কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপিত হয়। ১২ এপ্রিল থেকে এই সদরদপ্তর কার্যক্রম শুরু করে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম.এ রব এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকারকে যথাক্রমে চীফ অব স্টাফ এবং ডেপুটি চীফ অব স্টাফ নিয়োগ করা হয়।

পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি আরও অনেক বাহিনী সংগঠিত হয়। এ সকল বাহিনীর মধ্যে টাঙ্গাইলের কাদের বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, ঝিনাইদহের আকবর হোসেন বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী, বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা বাহিনী ও গফুর বাহিনী এবং ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী ও আফতাব বাহিনী উল্লেখযোগ্য। এ সকল বাহিনী স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হয়ে নিজেদের শক্তিতে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার বরিশালে তাঁর বাহিনীকে সংগঠিত করেন। ভারতের সেনাবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল ওবানের সক্রিয় সহযোগিতায় মুজিব বাহিনী নামে আরেকটি বাহিনী গঠিত হয়। মুজিববাহিনীর সদস্যদের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান ছিলেন এই বাহিনীর সংগঠক।

কুজকাওয়াজরত নারীযোদ্ধা, ১৯৭১

মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ও অনিয়মিত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। অনিয়মিত বাহিনী গণবাহিনী নামে পরিচিত ছিল। নিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সৈন্যরা। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন সেক্টরে গণবাহিনীতে নিয়োগ করা হতো। গণবাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শত্রুর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাঠানো হয়। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্রবাহিনীর প্রথাগত যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। ‘জেড ফোর্স’ নামে পরিচিত নিয়মিত বাহিনীর প্রথম ব্রিগেডটি জুলাই মাসে গঠিত হয়। এই ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের নামের ইংরেজি আদ্যক্ষর ‘জেড’ অনুসারে ব্রিগেডটির নামকরণ করা হয়। ব্রিগেডটি ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত হয়। ‘এস ফোর্স’ নামে পরিচিত দ্বিতীয় নিয়মিত ব্রিগেডটি দ্বিতীয় ও একাদশ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের নিয়ে অক্টোবরে গঠিত হয়। এ ব্রিগেডের অধিনায়ক ছিলেন সফিউল্লাহ। খালেদ মোশাররফের অধিনায়কত্বে ‘কে ফোর্স’ গঠিত হয় ৪র্থ, ৯ম ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যদের নিয়ে।

নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠিত হয়। এর সংগঠক ছিলেন এয়ার কমোডর এ.কে খন্দকার। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম, ক্যাপ্টেন খালেক, সাত্তার, শাহাবুদ্দিন, মুকিত, আকরাম, শরফুদ্দিন এবং ৬৭ জন বিমানসেনা নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। তাদের সম্বল ছিল মাত্র কয়েকটি ডাকোটা, অটার টাইপ বিমান এবং অ্যালুভেট হেলিকপ্টার। অনুরূপভাবে, পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা নৌসেনাদের নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর প্রথম নৌবহর ‘বঙ্গবন্ধু নৌবহর’ উদ্বোধন করা হয়।

এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল মাত্র ৬টি ছোট নৌযান। নিয়মিত ব্রিগেড, সেক্টর ট্রুপ ও গেরিলা বাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সুসংগঠিত ছিল।

মুক্তিবাহিনী শুরুতে প্রতিরোধমূলক অনেকগুলো যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সাময়িক পশ্চাদপসরণ করতে হয়। মুক্তিবাহিনী অবশ্য পরে সংগঠিত হয়ে উন্নততর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একাত্তরের এপ্রিল-মে মাসের পর থেকে নব উদ্দীপনায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

অগ্রসরমান গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এ যুদ্ধকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করে পাকিস্তানকে কৌশলগত সমর্থন দেয়। পক্ষান্তরে, ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তাদের মিত্র দেশসমূহ এবং জাপান ও পশ্চিমের অনেক দেশের সাধারণ জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়।

এদিকে মুক্তিবাহিনীর সদরদপ্তরে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়। চিরাচরিত রণকৌশল পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজিত করার পক্ষে অনুকূল হবে না ভেবে সারাদেশে সর্বাত্মক গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেমতে সেক্টর কমান্ডারদের দেশের অভ্যন্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা যৌথ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। অবশ্য ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অমৃতসর, শ্রীনগর ও কাশ্মীর উপত্যকায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বোমা বর্ষণের পর থেকেই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে। তখনই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর উপর নির্দেশ আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রত্যাঘাত করার। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকে। ফলে পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে ভেটো প্রয়োগ করায় এই প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

ভারতীয় সৈন্য এবং এগারো নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার টঙ্গীর কাছে পৌঁছে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে তারা সাভারে অবস্থান নেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩৬ নম্বর ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল জমশেদ ঢাকা নগরীর সন্নিকটে মীরপুর সেতুর কাছে ভারতীয় অধিনায়ক মেজর জেনারেল নাগরাকে অভ্যর্থনা জানান। সকাল দশটায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সৈন্যরা ঢাকায় প্রবেশ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খসড়া দলিল নিয়ে অপরাহ্ণ এক ঘটিকায় ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা এক হেলিকপ্টার বহরে তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে বিকাল চারটায় ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছেন। মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি চীফ অব স্টাফ গ্রুপ-ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার। পরাজিত পাকিস্তানি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ.এ.কে নিয়াজী লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকে আত্মসমর্পণসূচক অভ্যর্থনা জানান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল পাঁচটা এক মিনিটে রমনা রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যৌথ কম্যান্ডের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তান বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী পাকিস্তানের আত্মসমপ©র্ণর দলিলে স্বাক্ষর করেন।  [রফিকুল ইসলাম]

WarOfLiberation.jpg

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন (সেক্টর) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সামরিক কৌশল হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র ভৌগোলিক এলাকাকে ১১টি সেক্টর বা রণাঙ্গনে ভাগ করা হয়। প্রতি সেক্টরে একজন সেক্টর কমান্ডার (অধিনায়ক) নিয়োগ করা হয়। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার জন্য প্রতিটি সেক্টরকে কয়েকটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি সাব-সেক্টরে একজন করে কমান্ডার নিয়োজিত হন।

১নং সেক্টর  চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা এবং নোয়াখালি জেলার মুহুরী নদীর পূর্বাংশের সমগ্র এলাকা নিয়ে গঠিত। এ সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল হরিনাতে। সেক্টর প্রধান ছিলেন প্রথমে মেজর জিয়াউর রহমান এবং পরে মেজর রফিকুল ইসলাম। এই সেক্টরের পাঁচটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: ঋষিমুখ (ক্যাপ্টেন শামসুল ইসলাম); শ্রীনগর (ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং পরে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান); মনুঘাট (ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান); তবলছড়ি (সুবেদার আলী হোসেন); এবং ডিমাগিরী (জনৈক সুবেদার)। এই সেক্টরে প্রায় দশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেন। এদের মধ্যে ছিলেন ই.পি.আর, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রায় দুই হাজার নিয়মিত সৈন্য এবং গণবাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় আট হাজার। এই বাহিনীর গেরিলাদের ১৩৭টি গ্রুপে দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো হয়।

২ নং সেক্টর  ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর এবং নোয়াখালি জেলার অংশ নিয়ে গঠিত। এ সেক্টরের বাহিনী গঠিত হয় ৪- ইস্টবেঙ্গল এবং কুমিল্লা ও নোয়াখালির ইপিআর বাহিনী নিয়ে। আগরতলার ২০ মাইল দক্ষিণে মেলাঘরে ছিল এ সেক্টরের সদরদপ্তর। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন প্রথমে মেজর খালেদ মোশাররফ এবং পরে মেজর এ.টি.এম হায়দার। এই সেক্টরের অধীনে প্রায় ৩৫ হাজারের মতো গেরিলা যুদ্ধ করেছে। নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ হাজার। এই সেক্টরের ছয়টি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: গঙ্গাসাগর, আখাউড়া ও কসবা (মাহবুব এবং পরে লেফটেন্যান্ট ফারুক ও লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবীর); মন্দভাব (ক্যাপ্টেন গাফফার); শালদানদী (আবদুস সালেক চৌধুরী); মতিনগর (লেফটেন্যান্ট দিদারুল আলম); নির্ভয়পুর (ক্যাপ্টেন আকবর এবং পরে লেফটেন্যান্ট মাহ্বুব); এবং রাজনগর (ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম এবং পরে ক্যাপ্টেন শহীদ ও লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামান)। এই সেক্টরের বাহিনীর অভিযানের ফলে কুমিল্লা ও ফেনীর মধ্যবর্তী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে পাক-বাহিনী সম্পূর্ণ বিতাড়িত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিককালে এই এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকারে থাকে। এই সেক্টরের বাহিনীর অভিযানের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো বেলোনিয়া সূচিবুূ্যহ প্রতিরক্ষা। ১ নং ও ২ নং সেক্টরের বাহিনীর যৌথ অভিযানের ফলে ২১ জুন পর্যন্ত বেলোনিয়া সূচিব্যুহের প্রবেশপথ সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। ২ নম্বর সেক্টরের কয়েকটি নিয়মিত কোম্পানি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনা করে। এই কোম্পানিগুলো ছিল সুবেদার লুৎফর রহমানের অধীনে বেগমগঞ্জ এলাকায় অভিযানরত নোয়াখালী কোম্পানি, সুবেদার জহিরুল আলম খানের অধীনে চাঁদপুর মতলব এলাকায় অভিযানরত চাঁদপুর কোম্পানি, ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর অধীনে ঢাকার মানিকগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ এলাকায় অভিযানরত এক বিশাল বাহিনী, এবং ক্যাপ্টেন শওকতের অধীনে ফরিদপুরে অভিযানরত এক বাহিনী। শহরাঞ্চলের গেরিলারা ঢাকা শহরে কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করে।

৩ নং সেক্টর  উত্তরে চূড়ামনকাঠি (শ্রীমঙ্গলের নিকট) থেকে সিলেট এবং দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সিঙ্গারবিল পর্যন্ত এলাকা নিয়ে গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর কে.এম শফিউল্লাহ এবং পরে মেজর এ.এন.এম নূরুজ্জামান। দুই ইস্ট বেঙ্গল এবং সিলেট ও ময়মনসিংহের ইপিআর বাহিনী সমন্বয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টরের সদর দফতর ছিল হেজামারা। এই সেক্টরের অধীনে ১৯টি গেরিলা ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল। নভেম্বর মাস পর্যন্ত গেরিলার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ত্রিশ হাজার। তারা কুমিল্লা-সিলেট সড়কে কয়েকটি সেতু বিধ্বস্ত করে পাক বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাদের সবচেয়ে সফল আক্রমণ ছিল শায়েস্তাগঞ্জের নিকটে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মাইনের সাহায্যে একটি রেলগাড়ি বিধ্বস্ত করা। এই সেক্টরের দশটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: আশ্রমবাড়ি (ক্যাপ্টেন আজিজ এবং পরে ক্যাপ্টেন এজাজ); বাঘাইবাড়ি (ক্যাপ্টেন আজিজ এবং পরে ক্যাপ্টেন এজাজ); হাতকাটা (ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান); সিমলা (ক্যাপ্টেন মতিন); পঞ্চবটী (ক্যাপ্টেন নাসিম); মনতলা (ক্যাপ্টেন এম.এস.এ ভূঁইয়া); বিজয়নগর (এম.এস.এ ভূঁইয়া); কালাছড়া (লেফটেন্যান্ট মজুমদার); কলকলিয়া (লেফটেন্যান্ট গোলাম হেলাল মোরশেদ); এবং বামুটিয়া (লেফটেন্যান্ট সাঈদ)।

WarOfLiberationStretegy.jpg

৪নং সেক্টর  উত্তরে সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমা থেকে দক্ষিণে কানাইঘাট থানা পর্যন্ত ১০০ মাইল বিস্তৃত সীমান্ত এলাকা নিয়ে গঠিত। সিলেটের ইপিআর বাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে এ সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত এবং পরে ক্যাপ্টেন এ রব। হেডকোয়ার্টার ছিল প্রথমে করিমগঞ্জ এবং পরে আসামের মাসিমপুরে। সেক্টরে গেরিলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ হাজার এবং নিয়মিত বাহিনী ছিল প্রায় ৪ হাজার। এই সেক্টরের ছয়টি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: জালালপুর (মাসুদুর রব শাদী); বড়পুঞ্জী (ক্যাপ্টেন এ. রব); আমলাসিদ (লেফটেন্যান্ট জহির); কুকিতল (ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কাদের এবং পরে ক্যাপ্টেন শরিফুল হক); কৈলাশ শহর (লেফটেন্যান্ট উয়াকিউজ্জামান); এবং কমলপুর (ক্যাপ্টেন এনাম)।

৫ নং সেক্টর  সিলেট জেলার দুর্গাপুর থেকে ডাউকি (তামাবিল) এবং জেলার পূর্বসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। হেড কোয়ার্টার ছিল বাঁশতলাতে। আটশত নিয়মিত সৈন্য এবং পাঁচ হাজার গেরিলা সৈন্য সমন্বয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সুনামগঞ্জ ও ছাতকের অধিকাংশ জলাভূমি ছিল এই সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। এই সেক্টরের ছয়টি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: মুক্তাপুর (সুবেদার নাজির হোসেন এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ফারুক); ডাউকি (সুবেদার মেজর বি.আর চৌধুরী); শেলা (ক্যাপ্টেন হেলাল; সহযোগী কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মাহবুবর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট আবদুর রউফ); ভোলাগঞ্জ (লেফটেন্যান্ট তাহেরউদ্দিন আখুঞ্জী; সহযোগী কমান্ডার লেফটেন্যান্ট এস.এম খালেদ); বালাট (সুবেদার গনি এবং পরে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন ও এনামুল হক চৌধুরী); এবং বড়ছড়া (ক্যাপ্টেন মুসলিম উদ্দিন)। এই সেক্টরের বাহিনী সিলেট, তামাবিল ও সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে বেশ কিছুসংখ্যক সেতু বিধ্বস্ত করে। এই সেক্টরের সর্বাধিক সফল অপারেশন ছিল ছাতক আক্রমণ।

৬ নং সেক্টর  সমগ্র রংপুর জেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা নিয়ে গঠিত। প্রধানত রংপুর ও দিনাজপুরের ইপিআর বাহিনী নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার। সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল পাটগ্রামের নিকটবর্তী বুড়ীমারিতে। এটিই ছিল একমাত্র সেক্টর যার হেড কোয়ার্টার ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সেক্টরের সৈন্যসংখ্যা ছিল ৭০০ এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার। এদের মধ্যে ছিল ২০০০ নিয়মিত সৈন্য এবং ৯০০০ গণবাহিনী। এই সেক্টরের পাঁচটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: ভজনপুর (ক্যাপ্টেন নজরুল এবং পরে স্কোয়াড্রন লীডার সদরউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার); পাটগ্রাম (প্রথমে কয়েকজন ই.পি.আর জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার কমান্ড করেন। পরে ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এই সাব-সেক্টরের দায়িত্ব নেন); সাহেবগঞ্জ (ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন); মোগলহাট (ক্যাপ্টেন দেলওয়ার); এবং চিলাহাটি (ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ইকবাল)। এই সেক্টরের বাহিনী রংপুর জেলার উত্তরাংশ নিজেদের দখলে রাখে।

মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী হানাদার পাকসেনা

৭ নং সেক্টর  রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাংশ নিয়ে গঠিত হয়। ইপিআর সৈন্যদের নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এই বাহিনী ক্যাপ্টেন গিয়াস ও ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বে রাজশাহীতে প্রাথমিক অভিযান পরিচালনা করে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হক এবং পরে সুবেদার মেজর এ. রব ও মেজর কাজী নূরুজ্জামান। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল বালুরঘাটের নিকটবর্তী তরঙ্গপুরে। ২৫০০ নিয়মিত সৈন্য ও ১২৫০০ গেরিলা সৈন্য সমন্বয়ে প্রায় ১৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা এই সেক্টরে যুদ্ধ করে। এই সেক্টরের আটটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: মালন (প্রথমে কয়েকজন জুনিয়র অফিসার এবং পরে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর); তপন (মেজর নজমুল হক এবং পরে কয়েকজন জুনিয়র ই.পি.আর অফিসার); মেহেদীপুর (সুবেদার ইলিয়াস এবং পরে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর); হামজাপুর (ক্যাপ্টেন ইদ্রিস); আঙ্গিনাবাদ (একজন গণবাহিনীর সদস্য); শেখপাড়া (ক্যাপ্টেন রশীদ); ঠোকরাবাড়ি (সুবেদার মোয়াজ্জেম); এবং লালগোলা (ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী)। এই সেক্টরের বাহিনী জুন মাসে মহেশকান্দা ও পরাগপুর এবং আগস্ট মাসে মোহনপুর থানা আক্রমণ করে বিপুল সংখ্যক শত্রুসৈন্য বিধ্বস্ত করে। হামজাপুর সাব-সেক্টরের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ইদ্রিস তাঁর বাহিনী নিয়ে কয়েকটি পাকিস্তানী বাহিনীর উপর অতর্কিত আক্রমণ চালান এবং পার্বতীপুরের নিকটে একটি ট্রেন বিধ্বস্ত করেন।

৮ নং সেক্টর  এপ্রিল মাসে এই সেক্টরের অপারেশনাল এলাকা ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলা। মে মাসের শেষে অপারেশন এলাকা সঙ্কুচিত করে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা জেলা, সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে এই সেক্টর পুনর্গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরে মেজর এম.এ মঞ্জুর। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল কল্যানীতে। সেক্টরের সৈন্যদের মধ্যে ৩০০০ ছিল নিয়মিত বাহিনী এবং ২৫০০০ গেরিলা সৈন্য।  নিয়মিত বাহিনী কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এবং গেরিলা বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েকটি ঘাঁটি গড়ে তোলে। এই সেক্টরের সৈন্যরা যুদ্ধে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে। নিয়মিত বাহিনী বাংলাদেশের ৭-৮ মাইল অভ্যন্তরভাগে ঢুকে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে এবং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যাতে পাকবাহিনী তাদের উপর আক্রমণ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হয়। এই ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণকারী পাকবাহিনীর বহুসংখ্যক সৈন্য বিধ্বস্ত করে। এই সেক্টরের সাতটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: বয়রা (ক্যাপ্টেন খোন্দকার নজমুল হুদা); হাকিমপুর (ক্যাপ্টেন শফিক উল্লাহ); ভোমরা (ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এবং পরে ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দীন); লালবাজার (ক্যাপ্টেন এ.আর আযম চৌধুরী); বানপুর (ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান); বেনাপোল (ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম এবং পরে ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী); শিকারপুর (ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং পরে লেফটেন্যান্ট জাহাঙ্গীর)।

বিজয়- উল্লাসরত মুক্তিযোদ্ধাদল

৯ নং সেক্টর  বরিশাল ও পটুয়াখালি জেলা এবং খুলনা ও ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। এই সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল বশিরহাটের নিকটবর্তী টাকিতে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম.এ জলিল এবং পরে মেজর এম.এ মঞ্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদীন। এই সেক্টরে প্রায় বিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করে। এই সেক্টরকে টাকি, হিঙ্গলগঞ্জ ও শমসেরনগর তিনটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। এই সেক্টরে নিয়মিত বাহিনীও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আক্রমণ পরিচালনা করে। ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে এক বিশাল গেরিলা বাহিনী বরিশালে অভিযান করে। পটুয়াখালীতে একটি স্থায়ী ঘাটি থেকে ক্যাপ্টেন মেহদী আলী ইমাম আক্রমণ পরিচালনা করেন। লেফটেন্যান্ট জিয়া সুন্দরবন এলাকায় এক বিশাল বাহিনী পরিচালনা করেন। ক্যাপ্টেন হুদা নিয়মিত বাহিনীর এক বিশাল অংশ নিয়ে সীমান্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি জুন মাসে শত্রুর উকশা সীমান্ত ঘাটি দখল করেন এবং বরাবর তা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে থাকে। এই সেক্টরের বাহিনী দেভাতা ও শ্যামনগর থানা আক্রমণ করে দখল করে নেয়। নৌ-প্রহরার মাধ্যমে বরিশাল-পটুয়াখালীর নদী এলাকায় প্রাধান্য বিস্তার করা হয়। ডিসেম্বরে মাসে চূড়ান্ত আক্রমণের পূর্বে এই সেক্টরকে ৮ নং সেক্টরের সঙ্গে একীভূত করা হয় এবং এর দায়িত্ব অর্পিত হয় মেজর মঞ্জুরের উপর।

আত্নসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী

১০ নং সেক্টর  নৌ-কমান্ডো বাহিনী নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এই বাহিনী গঠনের উদ্যোক্তা ছিলেন ফ্রান্সে প্রশিক্ষণরত পাকিস্তান নৌবাহিনীর আট জন বাঙালি নৌ-কর্মকর্তা। এঁরা ছিলেন গাজী মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ (চীফ পেটি অফিসার), সৈয়দ মোশাররফ হোসেন (পেটি অফিসার), আমিন উল্লাহ শেখ (পেটি অফিসার), আহসান উল্লাহ (এম.ই-১), এ.ডব্লিউ.চৌধুরী (আর.ও-১), বদিউল আলম (এম.ই-১), এ.আর মিয়া (ই.এন-১) এবং আবেদুর রহমান (স্টুয়ার্ড-১)। এই আটজন বাঙালি নাবিককে ভারতীয় নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় দিল্লির পার্শ্ববর্তী যমুনা নদীতে বিশেষ নৌ-প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর পর পাকিস্তান নৌবাহিনীর কিছুসংখ্যক নৌ-সেনা এদের সঙ্গে এসে যোগ দেন। বিভিন্ন সেক্টর থেকে এমন ১৫০ জন ছাত্র ভলান্টিয়ারকে বাছাই করা হয় যারা দক্ষ সাতারু হিসেবে পরিচিত এবং তাদের প্রশিক্ষণের জন্য এই ক্যাম্পে পাঠানো হয়। তাদের বোমা নিক্ষেপ এবং জাহাজ ধ্বংসের জন্য লিম্পেট মাইন ব্যবহারের কৌশল শিক্ষা দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এদের চারটি দল চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, দাউদকান্দি ও মংলা বন্দরে পাঠানো হয়। এদের দায়িত্ব ছিল উপকূলে নোঙ্গর করা জাহাজ ধ্বংস করা। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে (১৪ আগস্ট) এই চারটি দল একযোগে আক্রমণ চালিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস করে। এ ডব্লিউ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়োজিত দলটি পাকিস্তানি কার্গো জাহাজ এমডি ওহ্রমাজ্দ ও এমভি আল-আববাস সহ সাতটি জাহাজ ধ্বংস করে। এর পর অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দেশের সকল বন্দরে অনুরূপ আরো কয়েকটি অপারেশন চালানো হয় এবং বেশ কিছুসংখ্যক সমুদ্রগামী ও উপকূলীয় জাহাজ বন্দরে ডুবিয়ে দেয়া হয়। পরে ভারতীয় কমান্ডার এম.এন সুমন্ত এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।

১১ নং সেক্টর  টাঙ্গাইল জেলা এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমা ব্যতীত সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম. আবু তাহের। মেজর তাহের যুদ্ধে গুরুতর আহত হলে স্কোয়াড্রন লীডার হামিদুল্লাহকে সেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। মহেন্দ্রগঞ্জ ছিল সেক্টরের হেডকোয়ার্টার। এই সেক্টরে প্রায় ২৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেছে। এই সেক্টরের আটটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: মাইনকারচর (স্কোয়াড্রন লীডার হামিদুল্লাহ); মহেন্দ্রগঞ্জ (লেফটেন্যান্ট মিজান); পুরখাসিয়া (লেফটেন্যান্ট হাশেম); ঢালু (লেফটেন্যান্ট তাহের আহমদ এবং পরে লেফটেন্যান্ট কামাল); রংরা (মতিউর রহমান); শিববাড়ি (ই.পি.আর-এর কয়েকজন জুনিয়র অফিসার); বাগমারা (ই.পি.আর-এর কয়েকজন জুনিয়র অফিসার); এবং মহেশখোলা (জনৈক ই.পি.আর সদস্য)।  এই সেক্টরে ব্যাপক গেরিলা অপারেশন পরিচালিত হয়। নিয়মিত বাহিনী সীমান্ত এলাকায় মুক্ত অঞ্চল দখল করে রাখে। সুবেদার আফতাব যুদ্ধের সারা নয় মাস ধরে রাহুমনিতে মুক্ত এলাকা দখলে রাখেন। এই সেক্টরে মহিলারাও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে। তাছাড়া টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী তার জেলায় ১৬০০০ গেরিলা যোদ্ধা সংগঠিত করেন এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করেন।  [সৈয়দা মমতাজ শিরীন]

তথ্যসুত্রঃ বাংলাপিডিয়া